POST

করোনা মহামারির সময়ে শিক্ষাঃ কেমন ছিল বাংলাদেশের গার্মেন্টস শ্রমিকদের পরিবারের অভিজ্ঞতা?


কোভিড-১৯ এর সময় লকডাউন এবং স্কুল বন্ধ থাকার কারণে বাংলাদেশের ৩ কোটি ৬৫ লক্ষ শিক্ষার্থীর ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এর সুদূরপ্রসারী প্রভাবের মধ্যে রয়েছে শেখার ক্ষতি, ঝরে পড়ার হার বৃদ্ধি, এমনকি শিশুশ্রম বা বাল্যবিবাহের প্রবণতা বেড়ে যাওয়া। ইউনেস্কোর মতে, অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থা সশরীরে ক্লাসের অভাব সম্পূর্ণরূপে পূরণ করতে পারে না। তদুপরি, বিদ্যমান “ডিজিটাল বিভাজন” মহামারির মধ্যে শিক্ষার সুযোগের বৈষম্যকে আরও প্রকট করেছে।

২০২২ সালের জানুয়ারিতে “গার্মেন্ট ওয়ার্কার ডায়েরিজ” প্রকল্পের অংশ হিসাবে ১,২৮০ জন গার্মেন্টস কর্মীর ওপর তাদের পরিবারের শিশুদের শিক্ষার বিষয়ে জরিপ করা হয়েছিল। জরিপে অংশগ্রহণকারী গার্মেন্টস কর্মীদের পরিবারগুলির মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি পরিবারে (৫৬%) ১৯ বছরের কম বয়সী এক বা একাধিক শিশু রয়েছে। চলমান কোভিড-১৯ মহামারি পরিস্থিতিতে এই শিশুরা যেসব চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে সেগুলির ওপর এই জরিপটি আলোকপাত করেছে। যেমন অনলাইন ক্লাসে শিশুদের অংশগ্রহণের হার, অংশগ্রহণ করতে বিভিন্ন অসুবিধার সম্মুখীন হওয়া, অনলাইন ক্লাসের কার্যকারিতা এবং শেখার ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা ইত্যাদি বিষয়ে জিজ্ঞাসা করে শিক্ষার ওপর করোনা মহামারির প্রভাব আরও ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করেছে এই জরিপটি।

দ্রষ্টব্যঃ ব্লগে ব্যবহৃত ছবিটি বাংলাদেশের একজন পোশাক শ্রমিকের অনুমতিক্রমে ব্যবহৃত হয়েছে।পূর্ণসংখ্যায় রুপান্তর করার কারণে গ্রাফে উল্লিখিত শতাংশের সমষ্টি ১০০ নাও হতে পারে।

শেখার ক্ষতি

বাংলাদেশে মহামারি চলাকালীন সশরীরে ক্লাস পরিচালনা করা সম্ভব না হওয়ায় অনেক স্কুল এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনলাইন মিটিং পরিসেবার বিভিন্ন অ্যাপস বা সফ্টওয়্যারের মাধ্যমে অথবা সোশ্যাল মিডিয়ার (ফেসবুক/ইউটিউব) মাধ্যমে অনলাইন ক্লাস ও দূরশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছিল। জরিপে অংশগ্রহণকারী গার্মেন্টস কর্মীদের পরিবারগুলির মধ্যে ৫৬% পরিবারে ১৯ বছরের কম বয়সী এক বা একাধিক শিশু রয়েছে। জরিপে অংশগ্রহণ করা যেসব পরিবারে ১৯ বছরের কম বয়সী এক বা একাধিক শিশু রয়েছে, সেসব পরিবারের মধ্যে ৬১% পরিবারে অন্তত একজন স্কুলগামী শিশু রয়েছে। স্কুলগামী শিশু রয়েছে এমন পরিবারের মধ্যে ১১% জানিয়েছে যে তাদের সন্তানদের স্কুল নিয়মিত অনলাইন ক্লাস নিয়েছে, ২৬% এর মতে স্কুল অনলাইন ক্লাস নিলেও তা নিয়মিত নয়, এবং অর্ধেকেরও বেশি পরিবার (৫৩%) জানিয়েছে যে তাদের সন্তানদের স্কুল কোনও অনলাইন ক্লাস নেয়নি। এই পরিসংখ্যানের মাধ্যমে এটিই স্পষ্ট হয় যে অনলাইন ক্লাসের ব্যবস্থা করার মত সমান সক্ষমতা সব স্কুলের নেই।

জরিপটি স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছে যে ইন্টারনেট, ডিভাইস কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা না থাকার কারণে নিম্ন আয়ের পরিবারের শিশুদের পক্ষে অনলাইন ক্লাসে উপস্থিত হওয়া খুব কঠিন হয়ে পড়ে এবং এ কারণে তারা পিছিয়ে পড়ে। স্কুল অনলাইনে ক্লাস নিলেও অংশগ্রহণকারী পরিবারগুলির মধ্যে (যাদের স্কুলগামী শিশু রয়েছে) মাত্র ৯% পরিবারের শিক্ষার্থীরা নিয়মিত অনলাইন ক্লাসে যোগ দিতে পেরেছে, ২১% পরিবারের শিক্ষার্থীরা অনলাইন ক্লাসে উপস্থিত থাকলেও নিয়মিত থাকতে পারেনি এবং বাকি ৬০% পরিবারের শিক্ষার্থীরা একেবারেই যোগ দিতে পারেনি। শিক্ষার্থীরা অনলাইন ক্লাসে যোগ দিতে বিভিন্ন অসুবিধার সম্মুখীন হয়েছে যার মধ্যে রয়েছে কোনও ডিভাইস না থাকা (১৫%), পর্যাপ্ত ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক সুবিধা না থাকা (১৪%), পর্যাপ্ত ডিভাইস না থাকা (১১%), ইন্টারনেটের খরচ দিতে না পারা (১০%), অনলাইন ক্লাসের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত না থাকা (১০%), এবং প্রযুক্তিতে অভ্যস্ত না হওয়া (১০%)। অনলাইন শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ইন্টারনেট পরিসেবার বিল নিজেদেরকেই পরিশোধ করতে হয় বলে জানিয়েছেন প্রায় সব উত্তরদাতা (৯৪%)।

তাছাড়া অনলাইন ক্লাসগুলিও নিম্নমানের বলে এই জরিপে জানা গেছে। অনলাইন ক্লাসে অংশগ্রহণকারী শিশু রয়েছে এমন ৩১% উত্তরদাতার মতে ক্লাসগুলি খুবই অকার্যকর বা অকার্যকর। মাত্র ১৮% উত্তরদাতা এগুলিকে কার্যকর বা খুবই কার্যকর বলে মনে করেছেন এবং উত্তরদাতাদের বাকি অর্ধেক (৫২%) এর কার্যকারিতা সম্পর্কে অনিশ্চয়তা প্রকাশ করেছেন।

অনলাইন ক্লাসের বিকল্প

জরিপে জানা গেছে যে গার্মেন্টস কর্মীরা তাদের সন্তানদের মহামারির সময়ে পড়াশুনার ঘাটতি কাটিয়ে ওঠার জন্য বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেছেন। মহামারিতে স্কুলের মাধ্যমে মানসম্পন্ন শিক্ষার পর্যাপ্ত সুযোগ না পাওয়ায় বাবা-মা নিজেরাই তাদের সন্তানদের বাড়িতে পড়িয়েছেন, শিশুরা স্বেচ্ছায় বাড়িতে নিজে পড়াশোনা করেছে, বাবা-মায়েরা গৃহশিক্ষক নিয়োগ দিয়েছেন, বা বড় ভাইবোন তাদের ছোট ভাইবোনদের পড়াশোনায় সহায়তা করেছে। অংশগ্রহণকারী গার্মেন্টস কর্মীদের মতে এই কৌশলগুলি কাজে লাগিয়ে তারা মহামারির সময় তাদের সন্তানদের শেখার ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ২৪% ছেলেশিশু এবং ২১% মেয়েশিশু এখনও তাদের শেখার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারেনি।

ঝরে পড়া

স্কুল থেকে ঝরে পড়ার হার সম্পর্কে ধারণা পেতে, জরিপে গার্মেন্টস কর্মীদের জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে কোভিড-১৯ এর পরে স্কুলে সশরীরে ক্লাস পুনরায় চালু হলে তাদের পরিবারের শিশুরা আবার পড়াশোনা চালিয়ে যাবে কিনা। উদ্বেগজনকভাবে, স্কুলগামী শিশু রয়েছে এমন ৯% পরিবার ধারণা করেছে যে তাদের পরিবারের কিছু শিশু বা সব শিশু কোভিড-১৯ এর পরে তাদের পড়াশোনা আর চালিয়ে যাবে না। ঝরে পড়ার কারণগুলির মধ্যে অন্যতম হল তারা এখন পড়াশোনার খরচ বহন করতে অক্ষম অথবা তাদের শিশুরা মহামারির সময় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হয়ে পড়ায় তাদের পক্ষে আর পড়াশোনায় ফিরে আসা সম্ভব নয়।

গার্মেন্টস কর্মী পরিবারের ছেলেশিশুদের তুলনায় মেয়েশিশুদের ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত শিক্ষার বছরের সংখ্যা ইতিমধ্যেই কম। যেখানে ছেলেশিশুদের মধ্যে ৮৯% শিশুর পরিবার আশা করে যে তারা অন্তত তাদের উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি পার হবে, সেখানে মাত্র ৭৭% মেয়েশিশুর পরিবার একই ধরণের আশা করে। অন্যদিকে, স্নাতকোত্তর শিক্ষার স্তরে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে মেয়েশিশু এবং ছেলেশিশুদের জন্য পরিবারের প্রত্যাশা প্রায় একইরকমঃ ৩৭% ছেলেশিশুর পরিবার তাদের ছেলেদের স্নাতকোত্তর স্তরে পৌঁছানোর আশা রাখেন, মেয়েশিশুদের ক্ষেত্রে এই হার ৩৫%।

সরকারি উদ্যোগে অনাস্থা

কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে শেখার ক্ষতি, ঝরে পড়ার হার বৃদ্ধি এবং শিশুদের শিক্ষার ওপর অন্যান্য সুদূরপ্রসারী প্রভাব প্রশমিত করতে শিক্ষা খাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে সরকারের একটি বিশাল ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু, জরিপে অংশগ্রহণকারী গার্মেন্টস শ্রমিকদের মধ্যে ১৯% মনে করেন যে সরকার কর্তৃক গৃহীত ব্যবস্থাগুলি অপর্যাপ্ত, অন্যদিকে মাত্র ৮% উত্তরদাতা এগুলোকে যথেষ্ট বলে মনে করেন।

শিশুর যত্ন

যেহেতু স্কুল বন্ধের সময় শিশুরা বাড়িতে থাকে, কর্মক্ষেত্রে দিবাযত্ন কেন্দ্র বা পরিবারে সহায়ক সদস্য না থাকলে শিশুর যত্ন নেওয়া খুব কঠিন হতে পারে। প্রায় ৬২% কর্মী বলেছেন যে তাদের কারখানায় শিশুদের জন্য কোনও দিবাযত্নের ব্যবস্থা নেই এবং ২১% উত্তরদাতা জানিয়েছেন যে এরকম কোনো সেবা আছে কিনা সে বিষয়েও তারা নিশ্চিত নন। শিশুদের দিবাযত্ন কেন্দ্র রয়েছে এমন কারখানাগুলির মধ্যে ৮৮% কারখানায় মালিক দিবাযত্ন সেবার খরচ বহন করেন। কারখানায় দিবাযত্ন কেন্দ্রের অনুপস্থিতিতে, গার্মেন্টস কর্মী যখন কাজে যান তখন সাধারণত দাদা-দাদি বা নানা-নানি বাচ্চাদের দেখাশোনা করেন (৩১% ক্ষেত্রে), পাড়া-প্রতিবেশীরা দেখাশোনা করেন ১৯% ক্ষেত্রে। ১৪ বছরের কম বয়সী শিশু রয়েছে এমন ১২% পরিবারে যখন বাবা-মা কর্মস্থলে থাকে তখন বাচ্চাদের যত্ন নেওয়ার জন্য কেউ থাকে না।

মাইক্রোফিন্যান্স অপরচুনিটিজ (এমএফও)-এর সহযোগিতায় সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) গত ১৩ জানুয়ারি থেকে ২৩ জানুয়ারি ২০২২-এ এই জরিপটি পরিচালনা করে। মোট ১,২৮০ জন গার্মেন্টস কর্মীর ওপর জরিপ করা হয়েছে যাদের মধ্যে ৭৬% (৯৭৫ জন) মহিলা এবং ২৪% (৩০৫ জন) ছিলেন পুরুষ। প্রায় ৫৬% উত্তরদাতার পরিবারে ১৯ বছরের কম বয়সী এক বা একাধিক শিশু রয়েছে, তাদের মধ্যে ৩৩% পরিবারে একজন শিশু এবং ২২% পরিবারে ২ থেকে ৩ জন শিশু রয়েছে। প্রায় ৫৮% উত্তরদাতার পরিবারে এক বা একাধিক মেয়েশিশু রয়েছে এবং ৬৪% উত্তরদাতার পরিবারে এক বা একাধিক ছেলেশিশু রয়েছে। এর মধ্যে যেসব পরিবারে ১৯ বছরের কম বয়সী শিশু রয়েছে, তাদের প্রায় সকলেরই (৯০%) ১৪ বছরের কম বয়সী এক বা একাধিক শিশু রয়েছে। জরিপের আগের মাসে এই পরিবারগুলির বেশিরভাগের শিক্ষার পেছনে ব্যয় ১ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকার মধ্যে ছিল।